আগরতলা, ০৮ জুলাই : গত কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে উত্তর ও মধ্য ত্রিপুরার বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। উত্তর ত্রিপুরার মনু নদী এবং খোয়াই নদীর জলস্তর দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীতীরবর্তী এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ইতোমধ্যেই তেলিয়ামুড়ার একাধিক নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অন্যদিকে কৈলাসহর ও খোয়াই শহরে দুর্বল জল নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
উত্তর ত্রিপুরার অন্যতম প্রধান নদী মনুর জলস্তর দ্রুত বাড়লেও এখনও বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। তবে অব্যাহত বৃষ্টিপাতের কারণে মনু, ছামনু, ছৈল্যাংটা ও সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, আগামী এক-দুদিন একইভাবে বৃষ্টি চলতে থাকলে কৈলাসহর মহকুমার বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যার কবলে পড়তে পারে।
এদিকে টানা বর্ষণের জেরে কৈলাসহর শহরের একাধিক এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। টাউন কালীবাড়ি সংলগ্ন এলাকা, থানারোড, পশ্চিম বাজার এবং ফরেস্ট অফিস সংলগ্ন রাস্তায় জল জমে সাধারণ মানুষের চলাচলে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বর্ষাতেই একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হলেও স্থায়ী সমাধান এখনও অধরাই রয়ে গেছে।
অন্যদিকে খোয়াই জেলায় চলতি বর্ষার সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। খোয়াই শহরের জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়ায় দীর্ঘ ৪৩ বছর পর সুভাষপার্ক বাজার এলাকা জলের নিচে তলিয়ে গেছে। প্রবীণদের মতে, ১৯৮৩ সালের পর এবারই প্রথম এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সুভাষপার্ক, দুর্গানগর, সরকারি দ্বাদশ শ্রেণি বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা এবং পদ্মবিল অঞ্চলে জলাবদ্ধতা চরম আকার ধারণ করেছে। কোথাও রাস্তা ভেঙে গেছে, কোথাও ধানক্ষেত প্লাবিত হয়ে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
শহরের ড্রেনেজ আধুনিকীকরণের কাজ ধীরগতিতে চলার অভিযোগ তুলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। জলাবদ্ধতা পরিদর্শনে আসা সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর সঙ্গেও ব্যবসায়ীদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের ঘটনা ঘটে। তাঁদের দাবি, দ্রুত জল নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
এদিকে খোয়াই নদীর জলস্তর দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে নদীতীরবর্তী নিচু এলাকার বহু বাড়িতে বন্যার জল প্রবেশ করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং জরুরি পরিষেবাগুলিকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
তেলিয়ামুড়াতেও খোয়াই নদীর জল বেড়ে পুরপরিষদের ৪, ৫, ৬ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডসহ শান্তিনগর, দশমীঘাট, নেতাজিনগর, তৃষাবাড়ি, মোহরছড়া ও কল্যাণপুর এলাকার একাধিক বসতবাড়িতে জল ঢুকে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন।
পরিস্থিতি পরিদর্শনে তেলিয়ামুড়া পুরপরিষদের চেয়ারম্যান রূপক সরকার ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলি ঘুরে দেখেন। বন্যাদুর্গতদের জন্য ইতোমধ্যে ৭টি শরণার্থী শিবির এবং গ্রামাঞ্চলের জন্য মোহরছড়া স্কুলে একটি অতিরিক্ত শিবির চালু করা হয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দশমীঘাট এলাকার ১০ থেকে ১৫টি পরিবার শিশু মালঞ্চ স্কুলে খোলা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও প্রয়োজনীয় পরিষেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকযোগে নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। তেলিয়ামুড়া মহকুমা শাসক অপূর্ব কৃষ্ণ চক্রবর্তী জানান, মানুষের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষাই প্রশাসনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তিনি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের কোনো ঝুঁকি না নিয়ে নিকটবর্তী শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়ার এবং প্রশাসনের নির্দেশিকা মেনে চলার আহ্বান জানান।
আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েকদিনও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে মনু ও খোয়াই নদীর জলস্তর আরও বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি বজায় রেখে সম্ভাব্য যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন