আগরতলা, ৯ জুলাই : কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকার যৌথভাবে রাজ্যের জাতীয় সড়ক, রেলপথ, বিমানবন্দর, ইন্টারনেট ও মোবাইল সংযোগ, জলপথ এবং ব্যাঙ্কিং পরিষেবার উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ফলে ত্রিপুরা আজ দেশের অন্যতম দ্রুত উন্নয়নশীল রাজ্য। গত ৬ বছরে রাজ্যের জি এস ডি পি বেড়ে দ্বিগুন হয়েছে। আজ হাঁপানিয়াস্থিত আন্তর্জাতিক মেলা প্রাঙ্গণে আয়োজিত দু'দিন ব্যাপী ডেস্টিনেশন ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভের উদ্বোধন করে একথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডাঃ মানিক সাহা।
এদিনের অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং ডোনার মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া ভার্চুয়ালি অংশগ্রহন করেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে মুখ্যমন্ত্রী সহ অন্যান্য অতিথিগণ কনক্লেভ উপলক্ষে আয়োজিত থিম ভিত্তিক প্রদর্শনী স্টলের উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরা প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। এখানে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের বিপুল ভান্ডার, রাবার বাগান, জিআই-স্বীকৃত কুইন আনারস, উৎকৃষ্ট মানের আগর, বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ। ত্রিপুরা দেশের তৃতীয় পূর্ণ সাক্ষর রাজ্য এবং এখানে দক্ষ ও প্রযুক্তিগতভাবে প্রশিক্ষিত জনশক্তি রয়েছে। তিনি বলেন, শক্তিশালী পরিকাঠামো ও প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার করে রাজ্যে বেসরকারি বিনিয়োগের এখনই উপযুক্ত সময়। এই বিজনেস কনক্লেভে দেশ, বিদেশ এবং স্থানীয় ১২০০-রও বেশি শিল্পপতি, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ একত্রিত হয়েছেন। এই কনক্লেভে ১ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি সম্ভাব্য বিনিয়োগের লক্ষ্যে ২৫০-রও বেশি সমঝোতা পত্র (মউ) স্বাক্ষরিত হতে চলেছে। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য, সারা বছর নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতির কারণে ত্রিপুরা আজ একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। ভূমি, নগর পরিকল্পনা, শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পর্যটন সহ একাধিক ক্ষেত্রে ব্যাপক নীতিগত সংস্কার করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির 'রিফর্ম এক্সপ্রেস' কর্মসূচির অনুপ্রেরণায় ত্রিপুরা ডিরেগুলেশন ও কমপ্লায়েন্স রিডাকশন-এর প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় পর্যায়েই দেশের সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। শিল্প ও ব্যবসার অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত করা হয়েছে। 'স্বাগত' সিঙ্গেল উইন্ডো পোর্টাল চালু করা হয়েছে। সামাজিক, শিক্ষামূলক এবং বাণিজ্যিক প্রকল্পের জন্য সরকারি জমি অত্যন্ত স্বল্প লিজ মূল্যে উপলব্ধ রয়েছে। শিল্প ও ব্যবসা সংক্রান্ত সমস্ত অনুমোদন একক সংস্থার মাধ্যমে প্রদানকারী অল্প কয়েকটি রাজ্যের মধ্যে ত্রিপুরা অন্যতম। 'এক ব্যবসা, এক লাইসেন্স' আমাদের নীতি, ব্যবসা বানিজ্য সরলীকরণ আমাদের অঙ্গীকার এবং জীবনধারণকে সহজ করা আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে অভিমত ব্যক্ত করেন মুখ্যমন্ত্রী।
কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল ডেস্টিনেশন ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশ নিয়ে শিল্প উদ্যোগীদের এম.এস.এম.ই. ক্ষেত্রের এই সুযোগকে কাজে লাগাতে আহ্বান জানান। তিনি ডেস্টিনেশন ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভকে কেন্দ্র করে যে নতুন বাজারের সুযোগ সৃষ্টি হবে তার সুযোগ ত্রিপুরার উদ্যোগীদের কাজে লাগাতে বলেন। ত্রিপুরায় কৃষি, বাঁশ, রাবার, আগর প্রভৃতি প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য্যকে ভিত্তি করে উৎপাদনভিত্তিক শিল্প ও বাণিজ্যে ত্রিপুরা আগামী দিনে নতুন উচ্চতায় পৌঁছবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, উত্তর পূর্বাঞ্চলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৬,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তায় শিল্পনগরী গড়ে তোলা হবে এবং ভৌগোলিক দিক থেকে ত্রিপুরার বিশেষ অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য, দক্ষ মানবসম্পদ ও যুবশক্তি, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, ডিজিটাল প্রশাসন ব্যবস্থা ইত্যাদির জন্য অন্যান্য রাজ্যগুলির তুলনায় ত্রিপুরা বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ত্রিপুরাতে বিনিয়োগ মানে শুধু এক রাজ্যে বিনিয়োগ নয় বরং এক নতুন বৃহত্তর বাজারে প্রবেশ।
ত্রিপুরায় বিনিয়োগের সুবিধা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী আরও বলেন যে, ত্রিপুরা হচ্ছে দেশের মধ্যে প্রথম রাজ্য যেখানে ভারত সরকারের নির্ধারিত ফেজ-১ ও ফেজ-২ ডিরেগুলেশন ১০০ শতাংশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ফলে শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য আইন ও নিয়মনীতি সংক্রান্ত জটিলতা অনেক সহজ হয়েছে। তাছাড়া উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা সিঙ্গল উইন্ডো সিস্টেম, সরকারি তরফে ঘোষিত বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা, ডিজিটাল পরিকাঠামো তো রয়েছেই। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি, হীরা মডেল এবং মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহার নেতৃত্বে ত্রিপুরায় উন্নয়নের জোয়ার এসেছে। ত্রিপুরা এখন গোটা অঞ্চলেই উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।
ডেস্টিনেশন ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভ-২০২৬ এ ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করে কেন্দ্রীয় ডোনার মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য এম সিন্ধিয়া উপস্থিত উদ্যোগী এবং বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করেন। তিনি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ দিয়ে বলেন, ত্রিপুরায় বিনিয়োগ করলে এক নতুন বাজারের দরজা খুলে যাবে, কেননা ত্রিপুরা তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গেটওয়ে। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলিতে প্রধানমন্ত্রীর অষ্টলক্ষ্মীর এক রাজ্য হিসেবে ত্রিপুরায় অনেক উন্নতি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ায় এবং ত্রিপুরার নিজস্ব স্থানীয় সম্পদ ও সরকারের প্রচেষ্টার ফলে এখানে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। রাবার শিল্পের সম্ভাবনা, ত্রিপুরার উচ্চ স্বাক্ষরতার হার, আইটি ও আইটিইএস ক্ষেত্রে যুব শক্তির জন্য সম্ভাবনা, ত্রিপুরার উচ্চ জিডিপি ও উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন, বাংলাদেশের সাথে সম্ভাব্য রেল ও মৈত্রী সেতু দিয়ে সড়ক যোগাযোগ, সব কিছুই ত্রিপুরাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এসবের নিরিখে তিনি বিনিয়োগকারীদের ত্রিপুরার উন্নয়নের যাত্রাপথে সামিল হয়ে বিকশিত ভারত গড়ার প্রক্রিয়ায় যোগদান করতে আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী সান্ত্বনা চাকমা বলেন, ত্রিপুরা রাজ্য আগামী দিনে উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিনিয়োগের প্রবেশ দ্বার হয়ে উঠবে। অনুষ্ঠানে প্রতিকী হিসাবে কয়েকটি মউ হস্তান্তরিত করা হয়। তাছাড়া অনুষ্ঠানে রাজ্য মন্ত্রিসভার সকল সদস্যগণ, আগরতলা পুর নিগমের মেয়র সহ চিলি, বাংলাদেশ, নেপাল, সাউথ আফ্রিকা, কাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, ফিলিপিন্স'র রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, অন্যান্য প্রতিনিধিগণ এবং ব্যবসায়িক ও বিনিয়োগ প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তরের সচিব কিরণ গিত্যে এবং ধন্যবাদ সূচক বক্তব্য রাখেন ফিকি -এর নর্থইস্ট চ্যাপ্টারের চেয়ারপারসন রঞ্জিত বার্থাকুর। অনুষ্ঠানে ডেস্টিনেশন ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভ নিয়ে একটি তথ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়।
Flood Situation : টানা বর্ষণে খোয়াই-কৈলাশহর-তেলিয়ামুড়ায় বন্যার আশঙ্কা, প্রশাসনের সতর্কতা জারি


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন